মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০২৪
Online Edition

সিয়াম আত্মশুদ্ধির এক অনন্য অধ্যায়

 

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

সিয়ামকে আমরা রোজা বলে আখ্যায়িত করে থাকি। ‘সিয়াম’ শব্দটির অর্থ হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে পানাহার থেকে বিরত থাকা। মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে একান্তে মিলিত হবার মহাসাধনায় একাকার হওয়ার অবস্থা বিদ্যমান থাকায় পানাহার এবং দৈহিক চাহিদা মেটানোর পথকে পরিহার করা প্রয়োজন।  সেইসাথে আল্লাহর পরম প্রেমে মত্ত থাকার কারণে দুনিয়াবী প্রেম ও চাহিদাকে বর্জন করে এ ইবাদতটি রোজাদারকে সার্থক অবস্থানে নিয়ে যায়। মূলত, হিজরী বর্ষের নবম মাস রমযান। রমযানের অর্থ পুড়ে ফেলা, ধ্বংস করা, নিশ্চিহ্ন করা, রোদের প্রখরতা, উত্তাপ ইত্যাদি। লিসানুল আরব আভিধান গ্রন্থে এসেছে যে, ‘রমযান’ হচ্ছে কঠিন পিপাসার কারণে পেটের মধ্যে অনুভূত জ্বালা বা যন্ত্রণা। কারো কারো মতে, রমযান হলো এমন একটি ইবাদত, যা মানুষের কৃত পাপগুলোকে পুড়িয়ে ফেলে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে খরতাপে জমিন যেমন চৌচির হয় এবং বৈশাখের বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হলে যেমন তাতে তরতাজা শস্য-শ্যামলিমায় পূর্ণ সবুজ ফসলের সমারোহ চাষির মন প্রফুল্ল করে, তেমনি দীর্ঘ এগারটি মাস পরে মাহে রমজানের সিয়াম সাধনায় মানবদেহের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা রিপুগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং রোজার প্রভাবে মানবের ভেতর-বাহির কালিমামুক্ত হয়ে রোজাদার ব্যক্তি একজন সোনার মানুষে পরিণত হয়ে যায়; তখন তার অবস্থান নিষ্পাপ-মাসুম ফেরেশতাদের উপরে চলে যায়। 

রোজার ইতিহাস 

আনুষঙ্গিক বিচারে কিছুটা বৈচিত্র্য থাকলেও উম্মতভেদে রোজা একটি সুপ্রচীন আহকাম। মহানবী (স.)-এর পূর্ববর্তী উম্মতগণের ওপরও রোজা ফরজ ছিল। হজরত আদম (আ.) নিষিদ্ধ ফল খেয়ে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নেমে আসতে বাধ্য হন। সেই সময়ে তার দেহের রং কালো হয়ে যায়। ফলে তার দুর্দশা দেখে ফেরেশতাগণ কেঁদে কেঁদে আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করলেন, ‘হে আল্লাহ, আদম তোমার প্রিয় সৃষ্টি। তুমি তাকে জান্নাতে স্থান দিয়েছিলে, আমাদের দ্বারা তাকে সিজদাও করালে, আর একটি মাত্র ভুলের জন্য তার গায়ের রং কালো করে দিলে।’ তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.)-এর কাছে এই ওহি পাঠালেন, ‘তুমি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখো।’ আদম (আ.) তা-ই করলেন। ফলে তার দেহের রং আবারও উজ্জ্বল হয়ে গেল। এই জন্যই এই তিনটি দিনকে উজ্জ্বল দিন বলে। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রসুলুল্লাহ (স.) ঘরে ও সফরে এই উজ্জ্বল দিনে কখনো সিয়াম না করে থাকতেন না।’ (নাসায়ি মিসকাত)

হজরত নুহ (আ.)-এর যুগে প্রত্যেক মাসে পালন করা হতো তিনটি সিয়াম। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর যুগেও রোজা ছিল। হজরত মুসা (আ.) তুর পাহাড়ে ৪০ দিন পানাহার না করে কাটিয়েছিলেন। তাই ইহুদিরা সাধারণত মুসা (আ.)-এর অনুসরণে ৪০টি সিয়াম রাখা ভালো মনে করত। এর মধ্যে ৪০তম দিনটিতে তাদের রোজা রাখা ফরজ ছিল। হজরত দাউদ (আ.) তার যুগেও রোজার প্রচলন ছিল। রসুল (স.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় রোজা দাউদের (আ.) রোজা। তিনি এক দিন রোজা রাখতেন এবং এক দিন বিনা সওমে থাকতেন। হজরত ঈসা (আ.) এর জন্মের আগেও রোজার প্রমাণ পাওয়া যায়। মারিয়াম (আ.)-কে সমাজের কুৎসিত প্রশ্ন ও অন্যায় আচরণ থেকে বাঁচতে সুরা মারিয়াম ২৬ আয়াতে বলা হয়েছিল, ‘মানুষের মধ্যে কারো যদি তুমি দেখো তখন বোলো, আমি দয়াময়ের উদ্দেশে রোজা তথা মৌনতা অবলম্বনের মানত করেছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোনো মানুষের সঙ্গে বাক্যালাপ করব না।’ হজরত মুহাম্মদ (স.) নবী হবার পূর্বে আবরদের মুশরিকদের মধ্যে সিয়ামের প্রচলন ছিল। যেমন আয়িশাহ (রা.) বলেন, ‘আশুরার দিনে কুরাইশরা জাহিলি যুগে রোজা রাখতেন এবং রাসুল্লাহ (স.) জাহিলি যুগেও রোজা রাখতেন। অতঃপর তিনি যখন মদিনায় আসেন তখন ঐ রোজা নিজে রাখেন এবং সাহাবিদেরকে রোজা রাখার হুকুম দেন। পরিশেষে রমযানের সিয়াম যখন ফরজ হয় তখন তিনি আশুরার রোজা ছেড়ে দেন’ (মুসলিম ১১২৫ বুখারি)।

বৈদিক যুগে বেদের অনুসারী ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও ব্রত অর্থাৎ উপবাস ছিল। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা প্রতি মাসে দুটি দিন উপবাস থাকেন। একটি শুক্লপক্ষে, অন্যটি কৃষ্ণপক্ষে। এই উপবাসকে একাদশীর উপবাস বলা হয়ে থাকে। হিন্দু যোগীরা কখনো কখনো ৪০ দিন পানাহার ত্যাগ করে চল্লিশে ব্রত পালন করেন। হিন্দুদের মতো জৈনরাও উপবাস করেন। গুজরাট ও দাক্ষিণাত্যেও জৈনরা কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি বছরই উপবাস থাকেন। প্রাচীন মিশরীয়রাও উপবাস পালন করত। পারসিদের ধর্মেও উপবাস ছিল। বিশেষ করে তাদের ধর্মগুরুর জন্য পাঁচসালা উপবাস জরুরি ছিল।

হিন্দু ধর্মের উপবাস শুরু হয় মধ্যরাতের পূর্ব থেকে। খ্রিস্টান ধর্মে উপবাস শুরু হয় রাত্র ১০টার পর থেকে। এই ধরনের উপবাস একটানা পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতে থাকে তবে, কেউ যদি এই উপবাসে ক্ষুধায় কাতর বা দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে তার জন্য খাদ্যগ্রহণে বাধা নেই। তাদের এই উপবাসের উদ্দেশ্য হলো, প্রভুর রাগ বা গোস্বাকে দমন করা, কিন্তু ইসলামে রোজা শুরু হয় সুবহি সাদিক তথা রাতের শেষাংশে, শেষ হয় সূর্যাস্তে। রোজা হবে পুরো একটি দিনে। এতে রাতের মুহূর্ত অংশেও প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। এই পুরোটি দিনে খাদ্য-পানীয়, জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত থাকার নামই হচ্ছে সিয়াম সাধনা। ইসলামের দৃষ্টিতে সিয়াম সাধনায় উদ্দেশ্য প্রভুর রাগ বা গোস্বা দমন করা নয়, বরং সিয়াম সাধনায় একান্তভাবে আত্মনিয়োগ করে নিজের অপরাধসমূহ এবং রিপুসমূহকে পুড়িয়ে ফেলে নিষ্পাপ ফেরেশতাদের চেয়েও তাকওয়ার সর্বস্তরে আরোহণ করা এবং আরো পবিত্রতর জীবনলাভে নিজেকে ধন্য করা। সিয়াম সাধনার এই ইবাদতটিতে মানুষের মানবীয় গুণগুলো বিকশিত হয়। 

মাহে রমযান এক অনন্য সংস্কৃতি

‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা আল বাকারা, আয়াত : ১৮৩) এ আয়াতে রোজা ফরজ করার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, তাকওয়া অর্জন। তাকওয়া শব্দের আভিধানিক অর্থ সতর্ক হওয়া, ভয় করা, সংযত হওয়া, বেঁচে থাকা, পরহেজ করা, শক্তি সঞ্চয় করা, দায়িত্বশীল হওয়া, জবাবদিহির দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পাদন করা। পরিভাষায় তাকওয়া বলা হয় সতর্ক ও সচেতনতার সঙ্গে পরকালে আল্লাহতায়ালার কাছে জবাবদিহির মনোভাব নিয়ে নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী সব কাজ সম্পাদন করা। তার সন্তুষ্টির পরিপন্থী সব কাজ বর্জন করা। সত্যের সন্ধান, সত্য গ্রহণ, সত্যের ওপর অটল থাকা, আল্লাহভীতি, দায়িত্বানুভূতি, জবাবদিহিভিত্তিক দায়িত্বশীলতার সঙ্গে যথাযথভাবে কর্তব্য সম্পাদন। এই ছয়টি বৈশিষ্ট্যের আলোকে জীবনের সব কর্মকা- পরিচালনা করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী সব কাজ সম্পাদন করা, তার সন্তুষ্টির পরিপন্থী সব মত ও পথ পরিহার করা, যেসব কাজে তিনি অসন্তুষ্ট হন এবং যে পথে চললে তার সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়, তা বর্জন করার নামই তাকওয়া। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯০৩)

প্রথমত, মাহে রমযানের সিয়াম সাধনায় রোজাদার ব্যক্তির মধ্যে কেবল আল্লাহভীতিই সৃষ্টি হয় না, বরং তার মধ্যে মানবিক গুণগুলোও বিকশিত হয়। মানবিকতা হলো আল্লাহর সৃষ্টিকে ভালোবাসা, তার জন্য দরদী হওয়া, তার সুখে-দুঃখে সুখী এবং দুঃখী হওয়া এবং মানবজীবন থেকে দুর্দশা লাঘবে সাধ্যমত চেষ্টা করা। পরদুঃখে কাতর, কোমল হৃদয় এবং দয়ালু হওয়া। মানবতা নিয়ে কারো পাশে অবস্থান করা। মানবিক বা মানবিকতার বিপরীত শব্দ হলো, পাশবিক বা পাশবিকতা। পবিত্র মাহে রমযানের সিয়াম সাধনা মানুষকে মানবিক এবং একান্তই মানবদরদী বানায়। হাদীস শরীফে এসেছে, একজন ব্যক্তি একটি কুকুরের পিপাসা নিবারণের ব্যবস্থা করায় আল্লাহপাক তার সকল অপরাধ ক্ষমা করে তাকে জান্নাতী ঘোষণা করেছেন। মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনে, তার ভাষা-পরিভাষা এবং ব্যবহারে পরিবর্তন আনে। যাকাত, ফিতরা এবং সাধারণ দান-অনুদান নিয়েও বিত্তবানরা দুঃখীদের সেবায় নিজেদের উৎসর্গিত করে। 

দ্বিতীয়ত, সমাজের সবাইকে নিয়ে শান্তিতে বসবাস করার নামই হচ্ছে সামাজিকতা। সামাজিক বন্ধন সৃষ্টিতে রোজার ভূমিকা অপরিসীম। প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন: যে রোজাদার ব্যক্তি অপর কোনো রোজাদারকে সাথে নিয়ে ইফতার করল মহান আল্লাহ তার জন্য ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির পয়গাম শুনান এবং এই ইফতারীর কারণে রোজাদারের কোনো সওয়াবের ঘাটতি হবে না। গরিব-দুঃখী, এতিম-মিসকিন, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে এমনকি মুসলিম অভাবীদের মাঝে ইফতার সামগ্রী বিলিবণ্টন করে এক বড় ধরনের সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করা যায়। ইফতারের কিছু পরেই মসজিদে তারাবীহের নামাজ আদায়ের জন্য একত্রি হওয়া এবং দীর্ঘক্ষণ যাবৎ তারাবীহ, বিতর ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ সত্যিকারে সামাজিক বন্ধনকে আরো মজবুত করে তোলে। 

তৃতীয়ত, হালাল খাবার আহরণ করা একজন মুসলিমের জন্য ঈমানের পরে অপরিহার্য একটি বিষয়। রোজা এমন একটি গোপন ইবাদত, যা রোজাদারের সাথেই উপস্থিত থাকার কারণে সে ঐ হারাম কাজটি করতে সক্ষম হয় না। সিয়াম সাধনা যেহেতু একজন রোজাদারের মধ্যে গরিব-দুঃখীদের প্রতি সহানভূতির মানসিকতা জাগ্রত করে, তখন সে নির্দ্বিধায় তার উপরে ফরজ যাকাত এবং সাদাকাতুল ফিতর গরিব-দুঃখীদের নিকট বিতরণ করা শুরু করে দেয়। তার অবস্থা এমন হয় যে, তার অর্থের বিনিময়ে আল্লাহর জান্নাত ক্রয়ের জন্য উৎসুক হয়ে পড়ে। সিয়াম সাধনা সিয়াম পালনকারীকে ধৈর্য ও সহানুভূতির শিক্ষা দান করে। আত্মসংযম ও আত্মত্যাগের মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দৈহিক, আত্মিক ও মানসিক অবস্থা পরিশুদ্ধ হয়। নিজে জঠরজ্বালা সহ্য করে এবং সমাজের গরিব-দুঃখী, ফকির-মিসকিন, যারা উপবাসে দিন কাটায়, তাদের অবস্থা অনুভব করে। তাই রমযান মাসকে বলা হয় ধৈর্য ও সহ-মমতার মাস।

চতুর্থত, রমযান মুমিনকে সহনশীল হতে শেখায়। ফলে সে অন্যের অন্যায় ও অবিচার উপেক্ষা করে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘রোজা ঢালস্বরূপ। তোমাদের মধ্যে কেউ যখন রোজা পালন করে, তখন সে যেন অশ্লীল বাক্য ব্যবহার না করে এবং উচ্চস্বরে কথা না বলে ও কারো ওপর রাগান্বিত না হয়। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে আসে, তখন সে যেন বলে, আমি রোজা পালন করছি।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২২১৭); রোজা মানুষকে পাপমুক্ত পবিত্র জীবনের অনুপ্রেরণা জোগায়। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস রেখে সওয়াবের নিয়তের রমযানে রাত জাগরণ করে (তারাবি ও তাহাজ্জুদ) আল্লাহ তার পূর্ববর্তী সব পাপ মার্জনা করে দেন।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২২০২); রোজা মানুষের অন্তর থেকে বিদ্বেষ দূর করে। তাই সমাজে সম্প্রীতি ও ভালোবাসা তৈরি হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রমযান ধৈর্যের মাস। প্রতি মাসে তিন দিন রোজা পালনে অন্তরের ক্রোধ ও বিদ্বেষ দূর হয়।’ (মুসনাদে আহমদ); রোজা পালনের মাধ্যমে বান্দা ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষ নিজের পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, পাড়া-প্রতিবেশীদের ব্যাপারে যে ফিতনায় পতিত হয়; নামায, রোজা, দান, (ন্যায়ের) আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ তা দূরীভূত করে দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫২৫); জাবির (রা.) বলতেন, ‘তুমি যখন রোজা রাখো, তখন যেন রোজা রাখে তোমার কান, তোমার চোখ, তোমার জিহ্বা মিথ্যা ও হারাম থেকে। তুমি প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া ছেড়ে দাও এবং তোমার জন্য আবশ্যক হলো স্থিরতা ও প্রশান্ত মন। তোমার রোজা রাখা দিন এবং রোজাহীন দিন যেন সমান না হয়।’ (খাওয়াতিন আওয়ার রমযানুল মোবারক, পৃষ্ঠা ১৮)

পঞ্চমত, আল্লাহ মুমিনদের দীনের সঠিক পথপ্রদর্শন করার কারণে তার শুকরিয়া আদায় করা অপরিহার্য। আর এ শুকরিয়া আদায় করা হয় সিয়াম সাধনা, তারাবি, ইফতার, সাহরি, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, জিকির-আজকার ইত্যাদির মাধ্যমে। উত্তম শুকরিয়া হলো, কর্মের মাধ্যমে তা প্রকাশ করা। আর কর্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কর্ম হলো সিয়াম সাধনা। আর এজন্যই সিয়ামের বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে। সিয়াম সাধনা প্রবৃত্তি দমনের মাধ্যমে কামনা-বাসনার শিখা নির্বাপিত করে। আত্মার লালসা দূরীভূত করে মুমিনের দেহ ও মনে পরিচ্ছন্নতা আনয়ন করে। ফলে সিয়াম সাধনা আত্মশুদ্ধির অন্যতম সুযোগ। সিয়াম প্রবৃত্তি পুড়ে ছাই করে দিয়ে মুত্তাকি হওয়ার পরম সুযোগ করে দেয়। সিয়াম সাধনা অনর্থক কাজ, মিথ্যা বচন, প্রবঞ্চনা, পরনিন্দা, অশ্লীলতা, অসৎকর্ম, কর্কশ বাক্য ব্যবহার ইত্যাদি থেকে মুক্ত রাখে। মহানবী (সা.) বলেন, পাঁচটি জিনিস সিয়াম নষ্ট করে দেয়। তা হলো- মিথ্যা কথা, পরনিন্দা, কূটনামি, মিথ্যা শপথ ও কামভাবে দৃষ্টিপাত। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা কাজ করা ছাড়তে পারল না, তার পানাহার ত্যাগ তথা রোজা রাখা আল্লাহর কোনোই প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ১৭৭০)

ষষ্ঠত, আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উৎকর্ষ সাধনে সিয়ামের ভূমিকা বর্ণনাতীত। সিয়াম সাধনায় যেমন আত্মিক পরিচ্ছন্নতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে দৈহিক সুস্থতা ও স্বাচ্ছন্দ্য। ডাক্তার আর ক্যামবারড বলেছেন, ‘সিয়াম পরিপক্ব শক্তির সহায়ক।’ আল্লামা ইবনুল কায়িম সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, সিয়ামের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে তার পাশবিক ইচ্ছা ও জৈবিক অভ্যাস থেকে মুক্ত করা এবং জৈবিক চাহিদাগুলোর মধ্যে সুস্থতা ও স্বাভাবিকতা প্রতিষ্ঠা করা। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জন করে চিরন্তন জীবনের অনন্ত সফলতার চূড়ায় আরোহণ করে। পশুত্ব নিস্তেজ হয়ে মনুষ্যত্ব জাগ্রত হয়। সিয়াম দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের প্রতি সহানুভূতির উদ্রেক করে মানুষের শারীরিক ও আত্মিক শক্তির ‌উন্নতি করে এবং পাশবিক চাহিদা, যা মানুষের স্বাস্থ্যকে ধ্বংস করে, তা থেকে মুক্ত করে। তদ্রুপ সিয়াম কলবের ইসলাহ ও চরিত্র সংশোধনের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। (জাদুল মাআদ, প্রম খন্ড , পৃষ্ঠা : ১৫২)

সপ্তমত, মানব দেহের মূল হলো নফস বা আত্মা। এই আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং মন্দ চিন্তা থেকে মুক্ত রাখার একমাত্র পন্থা হলো সিয়াম পালন। নফস বা প্রবৃত্তিকে বিবেকের শাসন মানতে অভ্যস্ত করে তোলাই সিয়ামের উদ্দেশ্য। প্রবৃত্তি ও বিবেক এই দুয়ের জয়-পরাজয় নিয়েই মানুষের মধ্যে পশুত্ব ও সততার জয়-পরাজয় সূচিত হয়ে থাকে আর সিয়াম পালনের মাধ্যমেই পশুত্বের ওপর সততা ও অন্যায়ের ওপর ন্যায় বিজয়ী হয়। ইমাম গাজালি (রহ.) ‘ইয়াহইয়াউল উলুম’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘আখলাকে ইলাহি তথা ঐশ্বরিক গুণে মানুষকে গুণান্বিত করে তোলাই সিয়ামের উদ্দেশ্য। আল্লাহতায়ালা পানাহার করেন না। রোজাদার পানাহার বর্জনের ফলে আখলাকে ইলাহির গুণে গুণান্বিত হয়। তদ্রুপ সিয়াম সাধনার মাধ্যমে রোজাদার ফেরেশতার গুণে গুণান্বিত হয়। ফেরেশতারা যেমন পানাহার করে না, রোজাদারও পানাহার করে না। ফলে পানাহার ও কামাচার বর্জনের দিক দিয়ে ফেরেশতা ও রোজাদার সমগুণে গুণান্বিত হয়। ফলে রোজাদার এমন মর্যাদাসম্পন্ন হয় যে, তার মুখের গন্ধ আল্লাহতায়ালার কাছে মৃগনাভির সুঘ্রাণের চেয়েও উত্তম। (মুসলিম, হাদিস : ১৯৪৫)

পরিশেষে বলা যায়, সিয়াম সাধনা নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখার শ্রেষ্ঠ পন্থা। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমযান মাস পেল অথচ গুনাহগুলো মাফ করিয়ে নিতে পারল না, সে ধ্বংস হোক। (আদারুল মুদরাবাদ, ইমাম বোখারি) এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তে দোয়া কবুল হয়। বিশেষ করে ইফতারের সময়, শেষ রাতে, কদরের রাতে, জুমার দিনে। এ মাসের দানে ৭০০ গুণ সওয়াব পাওয়া যায়। একটি নফল আদায় করলে ফরজের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। আল্লাহতায়ালা নিজে সিয়াম পালনকারীর প্রতিদান প্রদান করবেন বলে ঘোষণা করেছেন। (মুসলিম, হাদিস : ১৯৪৫)। জান্নাতে একটি দরজার নাম রাইয়ান, যা দিয়ে শুধু রোজাদাররাই প্রবেশ করবেন। আল্লামা ইউসুফ আল-কারজাভি (রহ.) লেখেন, রমযানের সামাজিক কল্যাণের অন্যতম দিক হলো ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষুধা ও অসহায় মানুষের অসহায়ত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা। রোজাদার তা অর্জন করে যকৃৎ ও নাড়ির আকুতি থেকে এ অভিজ্ঞতা লাভ করে। কেননা যারা প্রাচুর্যের মধ্যে বেড়ে উঠেছে, তারা ক্ষুধার জ্বালা, তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করতে পারে না। তারা মনে করে, সবাই তাদের মতো।’ সবদিক বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে নিজেকে পাপমুক্ত রাখার এবং অধিক পুণ্য লাভের মুখ্য সময় হলো এ মাহে রমযান। সত্যিকার অর্থে, তাকওয়া অর্জনে সমাজ-সংস্কৃতির অনন্য অধ্যায় সিয়াম।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ