মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০২৪
Online Edition

ঋণগ্রস্ত জাতির আত্মমর্যাদা থাকে না

 এম এ খালেক

আন্তর্জাতিক নাট্য ব্যক্তিত্ব হেনরিক ইবসেন একবার প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, ‘ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কোনো আত্মমর্যাদা থাকে না। তার সামাজিক মর্যাদা পদে পদে ভূলুন্ঠিত হয়।’ হেনরিক ইবসেনের এই মন্তব্য নির্মম হলেও সত্যি এবং বাস্তবসম্মত। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে পদে পদে লাঞ্ছিত হতে হয়। তাকে অপমান-গঞ্জনা সহ্য করতে হয়। আমাদের এলাকায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে-‘গরিবের বউ সবারই ভাবি।’ মানুষ যত প্রতিভাবান এবং গুরুত্বপূর্ণই হোন না কেনো তার সামাজিক মর্যাদা নিরূপিত হয় আর্থিক সামর্থ্যের নিরিখে। অর্থ-বিত্তহীন মানুষ সমাজে অপাংতেয় বলে বিবেচিত হন। অর্থাৎ একজন মানুষের সামাজিক মর্যাদা এবং গুরুত্ব নির্ণীত হয় অর্থ-বিত্তের মাপকাঠিতে। এটা ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য তেমনি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। কোনো রাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং পরমুখাপেক্ষী হয় তাহালে তাকে নানাভাবে উপেক্ষিত হতে হয়। দাতা সংস্থা, যাদের এখন আমরা উন্নয়ন সহযোগী বলে থাকি ঋণদানের ক্ষেত্রে তাদের আচরণ দেখলেই অনুধাবন করা যায় তারা দরিদ্র দেশগুলোর প্রতি কি রকম ব্যবহার করে। একই ধরনের ঋণ দানের বেলায় তারা বিত্তবান দেশ এবং বিত্তহীন দেশের ক্ষেত্রে ভিন্নতর শর্ত প্রয়োগ করে। দরিদ্র দেশগুলোকে ঋণদানের ক্ষেত্রে তারা এমন শর্তারোপ করে যা পরিপালন করতে গিয়ে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট দেশটির সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়। তাই প্রতিটি রাষ্ট্রই চেষ্টা করা উচিত কিভাবে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে সীমিত রাখা যায়। 

ঋণ গ্রহণ কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের নিকট কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কিন্তু তারপরও ঋণ গ্রহণ ব্যতীত আমাদের চলে না। বিশেষ করে রাষ্ট্রকে তার বিবিধ উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সূত্র থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হয়। এ ঋণের একটি বড় অংশই আসে বৈদেশিক উৎস থেকে। একটি দেশ যখন বিদেশি কোনো দেশ অথবা সংস্থার নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করে তখন তাকে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে আপোষ করতে হয়। এই আপোষ অনেক সময় অদৃশ্য থাকে। আবার কখনো কখনো তা প্রকাশ্যে জানা যায়। একটি মর্যাদাশীল কখনোই সখ করে বিদেশি ঋণ গ্রহণ করতে চায় না। তৃতীয় বিশে^র উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার অনেক সময় ঋণগ্রহণের ক্ষেত্রে বিলাসিতায় মত্ত হয়। আমাদের দেশে এমন এক সময় ছিল, বিশেষ করে গত শতাব্দীর আশির দশকে বিদেশি ঋণ প্রাপ্তিকে একটি সরকারের সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সেই সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি কার্যত বিদেশি ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতার পর একজন মার্কিন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশ সফরে এসে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য উপস্থাপনকালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেন ত্বরান্বিত হচ্ছে না সে সম্পর্কে কিছু কথা বলেছিলেন। তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের একজন তরুণ অধ্যাপক বলে উঠেন, আপনারা আমাদের অর্থনীতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপ করেন বলেই আমাদের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই বক্তব্য শ্রবণ করার পর মার্কিন অধ্যাপক কিছুক্ষণ চুপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, যে দেশের অর্থনীতির ৮০ শতাংশই আমাদের মতো দেশের ঋণের উপর দাঁড়িয়ে আছে সেই দেশের অর্থনীতি নিয়ে আমরা কথা বলবো না তো কে বলবে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক সেদিন আর কিছু বলতে পারেননি। এটাই বাস্তবতা। 

কোনো দেশই ইচ্ছে করে ঋণ গ্রহণ করতে চায় না। তারপরও ঋণ নিতে হয়। উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, ঋণ গ্রহণ করা এক ধরনের অধিকার। কারণ এই ঋণের অর্থ সুদসমেত নির্ধারিত সময়ে ফেরত দিতে হয়। তাই ঋণ কোনো করুণা বা দয়া নয়। এটা অধিকার। যেহেতু একটি দেশ গৃহীত ঋণের কিস্তি সুদসমেত নির্ধারিত সময়ে ফেরত দিতে আইনগতভাবে বাধ্য তাই সেই ঋণের অর্থ কিভাবে কোন খাতে ব্যবহার করা হবে সেটাই দেশটির এক্তিয়ারে থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। উন্নয়ন সহযোগীরা যে ঋণ প্রদান করে তার কোনোটিই শর্তহীন নয়। একটি দেশ তার উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে বিদেশি ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। তাই বলে কোনোভাবেই ঋণনির্ভর হয়ে পড়া উচিত নয়। যে কোনোভাবে ঋণনির্ভরতা থেকে উত্তরণের জন্য চেষ্টা চালানো প্রয়োজন। এখানে একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন, উন্নয়ন সহযোগীরা ঋণদানের জন্য সব সময়ই উদগ্রিব থাকে। কারণ দেশগুলো যদি বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ না করে তাহলে তাদের কার্যক্রম বন্ধ অথবা সীমিত হয়ে যাবে। যেসব দেশ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালি অর্থনীতির অধিকারী তাদের ঋণদানের ক্ষেত্রে সহজ শর্তারোপ করা হয়। কিন্তু যেসব দেশ দরিদ্র এবং ঋণ গ্রহণ ব্যতীত কোনো উপায় নেই সেই সব দেশের ক্ষেত্রে ঋণদানের শর্ত থাকে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কঠিন। এমন সব শর্তারোপ করা হয় যা ঋণ গ্রহীতা দেশটির স্বাধীনতার পরিপন্থি হয়ে ওঠে। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে প্রচুর পরিমাণ ঋণ এবং আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। সেই সময় অত্যন্ত সহজ শর্তে বাংলাদেশকে ঋণদান করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ঋণদানের শর্ত ক্রমশ কঠোর হতে থাকে। উন্নয়ন সহযোগী বিশ্ব ব্যাংক এবং ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) যে ঋণ প্রদান করে তা সব সময়ই শর্তযুক্ত হয়ে থাকে। বিশ্ব ব্যাংকের তুলনায় আইএমএফ’র ঋণের শর্ত অনেক বেশি কঠোর। বিশ্ব ব্যাংক এবং আইএমএফ ঋণদানের ক্ষেত্রে যে শর্তারোপ করে তা সব সময়ই পুঁজিবাদি দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় ব্যাপৃত থাকে। স্থানীয় সূত্র থেকে যে ঋণ গ্রহণ করা হয় তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। কিন্তু বিদেশি উৎস থেকে যে ঋণ গ্রহণ করা হয় তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার প্রয়োজন তেমন একটা পড়ে না। তাই সরকার এবং আরো সুস্পষ্ট করে বললে বলতে হয় সরকারে প্রভাবশালী আমলারা বিদেশি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সব সময়ই আগ্রহী থাকে। স্বল্প ব্যয়ে স্থানীয়ভাবে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের চেয়ে বিদেশ থেকে উচ্চ মূল্যে তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রেই তাদের বেশি আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। কারণ বিদেশি ঋণের মাধ্যমে কোনো পণ্য বা সেবা আমদানি করা হলে সেখানে কমিশন বাণিজ্য করার সুযোগ থাকে। এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা বিদেশি ঋণ থেকে কমিশন গ্রহণ করছেন নিয়মিতই। এরা বিদেশি ঋণ গ্রহণের অনুকূলে তদবির করে থাকেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় আমাদের কন্সাল জেনারেলকে নির্দেশনা দেই কানাডার বেগম পাড়ায় যেসব বাংলাদেশির বাড়ি রয়েছে তারা কারা। কারণ সেই সময় কানাডার বেগম পাড়া নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা হচ্ছিল। নির্দেশনার প্রেক্ষিতে কন্সাল জেনারেল আমাকে একটি তালিকা দিলেন। সেই তালিকায় স্থানপ্রাপ্তদের ২৮জন বাংলাদেশির মধ্যে ৪ জন হচ্ছেন রাজনীতিবিদ এবং অবশিষ্ট ২৪ জন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। আগে আমার ধারণা ছিল বেগম পাড়ায় রাজনীতিবিদদেরই বাড়ি রয়েছে। কিন্তু তালিকা প্রাপ্তির পর আমার সেই ধারণা ভুল বলে প্রতীয়মান হলো। বাংলাদেশের এক শ্রেণির আমলা এবং রাজনীতিবিদ আছেন যারা প্রয়োজন না থাকলেও বিদেশি ঋণ গ্রহণে উৎসাহী। তাদের এই অতি আগ্রহের কারণ নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হয় না।

বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের হার যেহেতু খুবই কম। তাই উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। কিন্তু সেই ঋণের অর্থ কিভাবে কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে এবং যে প্রকল্পে ঋণের অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে সেই প্রকল্পের আবশ্যকতা কতটা এসব বিষয় অনেক সময়ই বিবেচনায় নেয়া হয় না। ফলে গৃহীত ঋণের অর্থ নানাভাবে অপব্যহার হচ্ছে। বাংলাদেশের  বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের মাত্রা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা যে কোনো বিচারেই উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। ইতিপূর্বে আর কখনোই বৈদেশিক ঋণের স্থিতি এতটা বৃহৎ আকার ধারণ করেনি। গত ডিসেম্বর মাস শেষে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ১০০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১০ হাজার ৬৪ কোটি মার্কিন ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ১১ লাখ ৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ৯ হাজার ৬৫২ কোটি মার্কিন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বেড়েছে ৪১২ কোটি মার্কিন ডলার। গত বছর সেপ্টেম্বর শেষে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ৯ হাজার ৬৫৫ কোটি মার্কিন ডলার। পরবর্তী তিন মাসে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪০৯ কোটি মার্কিন ডলার। একই সময়ে ব্যক্তি খাতে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ কমেছে ৬৪ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৫-২০১৬অর্থবছর শেষে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ৪ হাজার ১১৭ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২২-২০২৩ অর্থবছর শেষে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৮১১ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থাৎ ৮ বছরে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দ্বিগুনেরও বেশি বেড়েছে। গত ডিসেম্বর কোয়ার্টার শেষে জনগণের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৯২ কোটি মার্কিন ডলার বা ৬৫ হাজার কোটি টাকা। মোট বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে সরকারি খাতে গৃহীত ঋণের পরিমাণ ৭৯ শতাংশ এবং ব্যক্তিখাতে এটা ২১ শতাংশ। গত ডিসেম্বর মাসে সরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৯৬৯ কোটি মার্কিন ডলার এবং ব্যক্তিখাতে এটা ছিল ২ হাজার ৯৫ কোটি মার্কিন ডলার। 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি দেশের জিডিপির তুলনায় গৃহীত ঋণের হার ৫৫ শতাংশের নিচে থাকলে তাকে নিরাপদ মনে করা হয়। ঊর্ধ্বে চলে গেলে তা দেশটির জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের জিডিপি-ডেবট রেশিও এখনো ৩৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। কিন্তু যেভাবে ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বিপদজনক পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ গ্রহণীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হলে কি অবস্থা হতে পারে তার প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ হচ্ছে দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। দক্ষিণ এশিয়ার ইমাজিং টাইগার খ্যাত শ্রীলঙ্কার জিডিপি-ডেবট রেশিও ১০৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। দেশটি গৃহীত বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে অপরাগতা প্রকাশ করে। ফলে তাদেরকে আন্তর্জাতিকভাবে ঋণ খেলাপি রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ যে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করেছে তার বিপরীতে কিস্তি পরিশোধের পরিমাণও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ১৯২ কোটি মার্কিন ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল বাবদ কিস্তি পরিশোধ করতে হয়েছে ২৬৮ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২৯-২০৩০ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল বাবদ কিস্তি পেিরশোধ করতে হবে ৫১৫ কোটি মার্কিন ডলার। তখন অবস্থা এতটাই প্রতিকূলে চলে যেতে পারে যে, নতুন করে ঋণ গ্রহণ করে আগে গৃহীত বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে গত ১০ বছরে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে আড়াইগুণ। জাতীয় বাজেটে বৈদেশিক ঋণের সুদ এবং আসল পরিশোধে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে তা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খাত। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ বৃদ্ধি পেয়েছে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৯শতাংশ। 

গৃহীত  বৈদেশিক ঋণ কোথায় কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি এই ঋণেরর অর্থ অনুৎপাদনশীল অথবা তুলনামূলক স্বল্প উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হয় তাহলে সেটা দেশটির জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। শ্রীলঙ্কা গৃহীত বৈদেশিক ঋণের বেশির ভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহার করেছে। ফলে তারা ব্যবহৃত ঋণের অর্থের রিটার্ন সঠিকভাবে পায় নি। তারা এমন একটি বিরান ভূমিতে আন্তর্জাতিক মানের একটি বিমানবন্দর তৈরি করেছিল যেখানে দিনে মাত্র ৮/১০টি বিমান উঠানামা করতো। এমন আরো অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল যা দেশটির উন্নয়নের জন্য খুব একটা সহায়ক হয়নি। দেশটি চীনা ডেবট ট্রাপে পড়েছিল। আফ্রিকার অনেক দেশ চীন ডেবট ট্রাপে পড়ে তাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ক্ষুণœ করে। এ জন্য অনেক দেশই এখন চীনা ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। চীনা ঋণের বৈশিষ্ট হচ্ছে তারা ঋণদানের ক্ষেত্রে তেমন কোনো শর্তারোপ করে না। ফলে যে কোনো দেশের সরকার চাইলেই চীনের নিকট পর্যাপ্ত পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করতে পারে। চীন ঋণদানের মাধ্যমে তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ আদায় করে থাকে। যেসব দেশ চীনের নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করে তারা চীনের পক্ষভুক্ত হয়ে যায়। 

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে চীনা ঋণের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশ বিভিন্ন সূত্র থেকে ঋণ গ্রহণ করে। ঋণের একটি বড় অংশই আসছে চীনের নিকট থেকে। বাংলাদেশ বর্তমানে ৩২টি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকে। এর মধ্যে বাংলাদেশকে ঋণদানের ক্ষেত্রে জাপানের অবস্থান সবার শীর্ষে। তারপর রয়েছে বিশ^ ব্যাংক, আইএমএফ এবং তার পরে অর্থাৎ চতুর্থ স্থানে রয়েছে চীন। এর মধ্যে আইএমএফ’র ঋণ সবচেয়ে বেশি কঠিন শর্তযুক্ত। বাংলাদেশ বিগত প্রায় এক যুগ আইএমএফ’র নিকট থেকে কোনো ঋণ গ্রহণ করেনি। ফলে বাংলাদেশকে আইএমএফ’ শর্ত পরিপালন করতে হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ আইএমএফ’র নিকট থেকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণের অনুমোদন পেয়েছে। এই ঋণের কিস্তি ছাড়করণের জন্য বাংলাদেশকে আর্থিক খাতে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কার্যক্রম সাধন করতে হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতি বছর যে বৈদেশিক ঋণ লাভ করে তার ১০ শতাংশ প্রদান করে চীন। চীনের ঋণ সহজ শর্তে পাওয়া যায় বলে সরকার সেই ঋণ গ্রহণ করছে। কিন্তু এই ঋণের অর্থ ব্যবহার করে জাতীয উন্নয়ন কতটা সাধন করা যাবে তা নিয়ে ভাবতে হবে। গত ৪ বছরে চীনা ঋণের ছাড় বেড়েছে দ্বিগুনেরও বেশি। চীন সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে ঋণদান করে ১৯৭৫ সালে। এরপর দেশটি বাংলাদেশকে যে ঋণ প্রদান করে তার পরিমাণ খুব একটা উল্লেখযোগ্য নয়। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বাংলাদেশ সফরের পর থেকে চীনা ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। গত ৪ বছরে চীন প্রায় ৩০০টি কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ঋণ ছাড়করণ করেছে। এটা এ পর্যন্ত তাদের দেয়া মোট ঋণের ৪০ শতাংশের মতো। গত দু’ বছর ধরে চীন ঋণ ছাড়ের ক্ষেত্রে চীন বিলিয়ন মার্কিন ডলারে ক্লাবে রয়েছে। এর মধ্যে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে চীন ১১২ কোটি ৬৮ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ ছাড়করণ করে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশকে ঋণদানকারি শীর্ষ ৫টি দেশের মধ্যে চীনের অবস্থান ছিল চতুর্থ। বর্ণিত বছরে বিশ^ব্যাংক ১৯৩ কোটি মার্কিন ডলার ঋণদানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ঋণদানকারি দেশগুলোর মধ্যে সবার শীর্ষে ছিল। ১৯০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণদানের মাধ্যমে জাপান ছিল দ্বিতীয় স্থানে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বাংলাদেশকে ১৫৬ কোটি মার্কিন ডলার ঋণদান করে। গত অর্থবছরে সবগুলো দেশ ও সংস্থা মিলে বাংলাদেশকে মোট ৯২৬ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিয়েছে। 

বাংলাদেশ বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ করছে। এর বিপরীতে ঋণদানকারীদের বিভিন্ন শর্ত মেনে চলতে হচ্ছে। শর্তযুক্ত ঋণ সাধারণত একটি দেশের টেকসই উন্নয়নে সহায়ক হয় না। উন্নয়ন সহযোগীদের উদ্দেশ্য সাধারণত ঋণগ্রহীতা দেশের দ্রুত এবং টেকসই উন্নয়ন অর্জন নয়। তারা বরং চায় দেশটি যাতে আরো বেশি পরিমাণে ঋণনির্ভর হয়ে পড়ে। বর্তমানে বৈদেশিক ঋণ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে দেয়া হয় না। এর অন্যতম উদ্দেশ্য থাকে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা। তাই বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের আরো সতর্ক থাকতে হবে। ঋণ ব্যবহার করে যেসব বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে তাদের বাস্তবায়নকাল এবং প্রাক্কলিত ব্যয় কেনো বৃদ্ধি পাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। জাতীয় স্বার্থে একান্ত প্রয়োজন নয় এমন প্রকল্প গ্রহণ না করাই ভালো। কারণ সরকার আজকে যে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করছেন তার দায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হবে। জনগণের ভাগ্য নিয়ে কোনোভাবেই ছিনিমিনি খেলা উচিত হবে না। তাই বলি সাধু সাবধান। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ