রবিবার ২১ জুলাই ২০২৪
Online Edition

গাজাবাসীর মানবেতর রমজান

 আলী আহমাদ মাবরুর

এবারের রোজায় একটি দিনও পার করা সম্ভব হয়নি যেদিন ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজাবাসীর কথা মনে পড়েনি। বিগত ৬ মাসে গাজা যুদ্ধ নিয়ে নিয়মিত লিখেছি, তাদের সংবাদগুলো প্রচার করেছি। নানা ধরনের বিশ্লেষণ পড়েছি। এ কারণে নিজের টাইমলাইনে এমনিতেও গাজার ছবি ও ভিডিও চলে আসে। তাছাড়া, রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেও যেহেতু গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলো না- তাই সেখানকার অসহায় ও সব হারানো মানুষগুলো কীভাবে এই মাসটি অতিবাহিত করছে- একজন অসহায় ও অক্ষম মুসলিম হিসেবে সেই ভাবনাগুলো সবসময়ই আমার চিন্তাভাবনাকে গ্রাস করেছে।

স্বজনহীন ইফতার : অনেকগুলো কারণে গাজায় রমজান মাসের এবারের চিত্র অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় কিংবা বিশে^র অন্য যে কোনো এলাকার বিচারে পুরোপুরি ভিন্ন। বিগত বছরগুলোর রোজাগুলোতে যে মানুষগুলোকে সাথে নিয়ে তারা ইফতার করতেন, পরিবারের যে সদস্যরা মিলে সাহরি করতেন, তাদের অনেকেই এখন আর জীবিত নেই। যুদ্ধের দামামায়, পরিবারকে সাথে নিয়ে ইফতার করার চিরচেনা আনন্দ এখন গাজাবাসীর জন্য শুধুই স্মৃতি। ইবরাহীম হাসৌনা নামের একজন যুবকের কথা পড়ছিলাম। তিনি মূলত একজন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তিনি এক ধরনের কনটেন্ট তৈরি করতেন। আর যুদ্ধ চলাকালীন এই অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে তিনি ফিলিস্তিনীদের ইতিবাচক কিছু দৃশ্যপট নিয়ে ভিডিও তৈরি করছেন, যাতে ফিলিস্তিনিরা উজ্জীবিত হয়, একটু হলেও স্বস্তিতে থাকে।

ইবরাহীম বলছিলেন, এবারের রোজার প্রায় প্রতিটি দিন তিনি নিয়মিত তার মায়ের কবরের পাশে যান, দোয়া করেন। তার মা শহীদ হওয়ার আগে তার ফোনে একটি ভয়েসমেইল পাঠিয়েছিলেন। ওটাই এখন ইবরাহীমের কাছে মায়ের শেষ স্মৃতি। শুধু মাকেই নয়, ইবরাহীম এবারের ইসরাইলী হামলায় পুরো পরিবারকে হারিয়েছেন। এর আগে প্রতি রমজানে বাবা, ভাইদের নিয়ে একসাথে মায়ের হাতের তৈরি ইফতার খেলেও, এবার একাই ইফতার করলেন ইবরাহীম। একা একা ইফতারের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ইবরাহীম বলেন, “আমি এবারের রমজানে যেকোনো মূল্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেছি। পরিবারের কেউ যে বেঁচে নেই তা আমি মনেও করতে চাইনি। রোজার সময়ে বিশেষ করে ইফতারে ও সাহরিতে মানুষ তাঁর মায়ের তৈরি খাবারের কথা মনে করে। মায়ের রান্নার চেয়ে পৃথিবীতে মজার আর কোনো খাবার নেই। আমি শুধু ভাবি, আবার যদি পরিবারকে সাথে নিয়ে সময় কাটাতে পারতাম!’  

ইবরাহীম কাঁদতে কাঁদতে আরো বলছিলেন, ‘আমি যদি এক, দুই বা তিন ঘণ্টার জন্যও কোথাও যেতাম, তাহলেও মা ফোন করা শুরু করতেন। কিন্তু এখন কেউ আর আমার কথা জিজ্ঞেস করে না, আমাকে আর সান্ত¡না দেয় না, আমার খোঁজ নেয় না। আমার মা আমাকে নিয়ে যেভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন সেভাবে আর কেউ আমাকে নিয়ে চিন্তা করে না।’

ইবরাহীমের মতো এমন স্বজনছাড়া রমজান কাটছে অসংখ্য গাজাবাসীর। একদিকে প্রিয়জন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে তীব্র খাদ্য সংকটে গাজাবাসীর জীবন দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে। উল্লেখ্য, গাজায় ৬ মাসের বেশি সময়ে ইসরাইলী হামলায় ৩১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনী। অবিরাম হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ২২ লাখ মানুষের এই জনপদ। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন অধিকাংশই। তাদের পালানোর কোনো পথ নেই। নেই চিকিৎসার সুযোগ। এমনকি মৃত স্বজনকে সমাহিত করার মতো জায়গাও এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না।

এবারের রমজান গাজাবাসীদের জন্য আরো একটি কারণে ব্যতিক্রম। এবার তারা কেবল আমলে বা ইবাদতে নয়, বরং নিজেদের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেই দিন অতিবাহিত করছেন। এই রমজানে হারিয়ে ফেলা মানুষগুরোর সাথে মিলিত হওয়ার জন্য তারা শেষ চেষ্টা করছেন। তাই বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে তারা আপনজন খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আবার ইসরাইলী বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন ভবনের ধ্বংসস্তূপেও তারা আপনজনের লাশ সন্ধান করছেন। এভাবেই রোজার দিনগুলো কাটছে গাজাবাসীর। 

দুর্ভিক্ষের মুখে গাজা : গাজায় এবারের রমজান বড়ো ধরনের একটি পরীক্ষা। এর মূল কারণ সেখানকার খাদ্য সংকট। পুরো গাজাতেই খাদ্যসংকট থাকলেও উত্তর গাজায় রীতিমতো দুর্ভিক্ষ চলছে। সেখানে অনাহারে এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। অনেকেই ধারণা করেছিল, রোজার মাস শুরু হলে ইসরাইলী বর্বর কর্তৃপক্ষ কিছুটা নমনীয় হবে এবং গাজায় ত্রাণসামগ্রী প্রবেশের অনুমতি দেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রমজান মাস চলমান থাকলেও গোটা গাজা উপত্যকাই তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং ত্রাণ বিতরণে ইসরাইলের নিষেধাজ্ঞা এখনো বলবৎ রয়েছে। গাজা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৭ অক্টোবর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত গাজা উপত্যকায় কেবলমাত্র অনাহারেই অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছে গাজার উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দারা। তারা কয়েকমাস ধরেই ত্রাণ পাচ্ছেন না। গাজার ২২ লাখ বাসিন্দার মধ্যে অন্তত ৫ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ দুর্ভিক্ষ থেকে আর এক পা দূরে আছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা। দুর্ভিক্ষ এড়ানোর জন্য তারা জরুরিভিত্তিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন।

ফিলিস্তিনী শরণার্থীদের জন্য জাতিসঙ্ঘের সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) জানিয়েছে, অবরুদ্ধ এই ভূখন্ডে ইসরাইলের মারাত্মক আক্রমণের মাঝেই গাজা উপত্যকাজুড়ে ক্ষুধা ছড়িয়ে পড়েছে। গাজার সর্বত্রই ক্ষুধা বিরাজ করছে। জাতিসঙ্ঘের এই সংস্থাটি বলেছে, পবিত্র রমজান চলছে কিন্তু ফিলিস্তিনী এই উপত্যকায় মানবিক পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক। সংস্থাটির ভাষায়, উত্তরের পরিস্থিতি দুঃখজনক, বারবার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও সেখানে স্থলপথে সাহায্য সরবরাহের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। রমজান চলে এসেছে অন্য দিকে মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। গাজার বাসিন্দারা ঘাসপাতার স্যুপ তৈরি করে ইফতার ও সাহরি করছেন- এরকম ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় অহরহ দেখা যাচ্ছে যা আমাদের হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে তুলছে।

মসজিদও নেই গাজাবাসীর : গাজাবাসী যেভাবে রমজান পার করছে তার সাথে বিশে^ আর কোথাও রমজান পালনের কোনো মিলই নেই। আমরা যেখানে মসজিদে গিয়ে নিরাপদে ও শান্তিতে ফরজ, সুন্নাত ও নফল আদায় করতে পারছি; গাজাবাসী সেই সুযোগটাও পাচ্ছে না। ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলের হামলায় এক হাজারের বেশি মসজিদ ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণে রাফা এলাকার আল-হুদা মসজিদ। গত মাসে সেটি ধ্বংস করে ইসরাইলী বাহিনী। একসময় সেখানে দেড় হাজার মানুষ নামায আদায় করতে পারতেন। বর্তমানে ধ্বংস হওয়া মসজিদটির ক্ষুদ্র একটি স্থানে নামায পড়ছেন মুসল্লিরা।

রাফার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনী ওমর নেহাদ বলেন, ‘আমি এর আগের বছরগুলোতে প্রতিদিন আলাদা আলাদা মসজিদে তারাবির নামায আদায় করতাম। এখন আর কোনো মসজিদ অবশিষ্ট নেই। সব ধ্বংস হয়ে গেছে।’ অন্যদিকে, গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফাহ’র ৩৮ বছর বয়সী ইংরেজির শিক্ষক হাসান বলেন, ‘এর আগেও যুদ্ধের সময় আমরা কঠিন রমজান কাটিয়েছি। কিন্তু এই প্রথম আমরা আমাদের বাড়িঘর ও শহর থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছি। কিন্তু আমরা রোজা রাখব। এই ধরনের সংকট একজনকে খোদা ও তার ধর্মের কাছাকাছি নিয়ে আসে।’ আর অব্যাহত হামলার মুখেও গাজার শিশুরা রমজান উদযাপন করছে বলেও জানান হাসান।

শুধু গাজা বা পশ্চিম তীরই নয়, একইসঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেরুজালেম শহরে অবস্থিত মুসলিমদের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ ও প্রথম কিবলা আল আকসায় মুসলিমদের প্রবেশে এবার নজিরবিহীন বাধা দেওয়া হয়েছে। ইসরাইলী বাহিনী এবার শুধুমাত্র চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের পবিত্র আল-আকসা মসজিদে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। ৪০ বছরের নিচে পুরুষ ও তরুণদের মসজিদটিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

এরপরও রোজা উদযাপন করছেন তারা : এক সময়, গাজার রমজান মাস ছিল আলোকিত। বাজার ছিল জমজমাট, ঘরে ঘরে ছিল উৎসবের আমেজ। রমজান মাসের চাঁদ দেখার পর থেকেই শুরু হয়ে যেতো আনন্দের মিছিল। রাতভর জেগে ইবাদত করা, তারাবি পড়া, সেহেরি ও ইফতারের আয়োজন, সব মিলিয়ে এক অন্য রকম আমেজ। মধ্যপ্রাচ্যে এমনিতেও রমজান আনন্দ আয়োজনের মাস হিসেবেই বিবেচিত হয় আর এর মধ্যে রমজান উদযাপন নিয়ে সুখ্যাতি ছিল গাজার। কিন্তু এবারের রামাদানে গাজার সেই আনন্দ আয়োজনের ছিটেফোঁটাও নেই। ইসরাইলী অবরোধের কারণে, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। রয়েছে বিদ্যুৎ ও খাবার পানির তীব্র সংকট। আরো আছে প্রতিটা সেকেন্ডে মিসাইল ও বোমা হামলার ভয়। এই পরিবেশে রমজান পালন করা গাজার মানুষের জন্য এক চরম পরীক্ষা। 

গাজার বাসিন্দা ফিলিস্তিনী নারী হানা আল-মাসনি নিজেকে অনেকের তুলনায় বরং সৌভাগ্যবতীই মনে করেন কেননা তার স্বামী ও ছয় সন্তান এখনো জীবিত। কিন্তু তাদের সাজানো সংসারটি এখন আর নেই। চিরচেনা ঘরটিও নেই। ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর তারা এখন আশ্রয় শিবিরের একটি কুঁড়ে ঘরে ঠাঁই পেয়েছেন। এরপরও সেখানেই তারা পবিত্র রমজানের প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে এবারের রমজানে নেই কোনো সাজসজ্জা, ভালো খাবারের ব্যবস্থা কিংবা লেবু, জায়তুন ও কমলাগাছের নিচে বসে কুরআন পাঠের আয়োজন। এমনকি সাহরি কিংবা ইফতারের জন্য সামান্য খাবারেরও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এই প্রসঙ্গে ৩৭ বছরের হানা আল মাসনি বলেন, ‘আমার মেয়েরা প্রতিবছর রমজানে বাড়ি সাজানোর জন্য পয়সা জমাত। আমিও প্রতিবছর রমজানে নতুন লণ্ঠন কিনতাম। তবে এবার এসবের কিছুই নেই। ব্যাপারটা ভীষণ হতাশা ও কষ্টের।’ গাজায় রমজান উদযাপন নিয়ে সম্প্রতি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে আল জাজিরা। সেখানে সোয়াদ আজফর নামে বাস্তুচ্যুত এক কিশোরীকে বলতে শোনা যায়, ‘আগে আমরা খেলতে খেলতে বাজি পুড়িয়ে রমজানকে স্বাগত জানাতাম। তার কিছুই এখন নেই।’

 সোয়াদের মা আত্তাফ আজফর মেয়ের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য রমজান উপলক্ষে তাদের তাঁবুতে হালকা আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করেছেন। তার মতে, “যুদ্ধের মাঝে রীতিমতো ট্রমায় থাকা শিশুদের একটু খুশি রাখতে এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা ভুলিয়ে রাখতেই এই আয়োজন। মধ্যবয়সী এই নারী বলেন, ‘রমজানের এই দিনগুলোর জন্য আমরা সারাবছর অপেক্ষা করতাম। কিন্তু এবার কীভাবে তাঁবুর ভেতর রোজা কাটছে জানি না। খাবার নেই, পানি নেই। কখনো এখানে তীব্র গরম, কখনো বৃষ্টি, কখনো শীত। এমন রমজান আমাদের জীবনে আগে কখনো আসেনি।’

আত্তাফ আজফর আরো বলেন, “এখন প্রতিদিন আমাদের ঘুম ভাঙে তীব্র অবসাদ ও বিষন্নতাকে সঙ্গী করে। আমরা হয়তো জীবিত আছি। কিন্তু এটাকে বেঁচে থাকা বলা যাবে না। আপনার যদি সব থাকে কিন্তু এরপর সব যদি একে একে চলে যায় কিন্তু আপনাকে তারপরও বেঁচে থাকতে হয় তাহলে সেই জীবনটা আর কত ভালোভাবে কাটানো যায়!”

খান ইউনিসের কাছে জাতিসংঘ পরিচালিত একটি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতেন হোসেন আল আওদাহ। সেখানেও ইসরাইলী বোমা হামলার পর এখন তিনি এসে রাফাহ শহরে আশ্রয় নিয়েছেন। তার অবস্থাও খুবই শোচনীয়। একটি সময়ে তিনি একটি আন্তর্জাতিক এনজিওতে কাজ করতেন। তার আয় রোজগারও ভালো ছিল। কিন্তু গাজায় ইসরাইলী হামলা শুরুর পর থেকে তিনি ও তার পরিবার আর মানসম্মত কোনো খাবার খাওয়ার সুযোগ পাননি। এখন টিনজাত মটরশুটি খেয়ে কোনো রকমে দিন পার করছেন হোসেন। রমজানেও এই নিয়মের হেরফের হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাজারে বাদাম আর শুকনা ফল পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণত এসব দিয়েই আমরা ইফতার করি। কিন্তু এবার এসব পণ্যের দাম বড্ড চড়া। তাই ইফতারেও মটরশুটিই খেতে হবে।’

ফিলিস্তিনী জাতিসত্তার কবি মাহমুদ দারবিশ লিখে গেছেন, 

‘এই যে আমরা হেঁটে যাই বোমার ভেতর দিয়ে

এতে কী তুমি মৃত্যুতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছ?

আমার তো এখনো জীবনের অভিলাষ আছে, 

আর আছে অনিঃশেষ বাসনা।’

জানি না, ফিলিস্তিনী মজলুম মানুষগুলোর স্বাধীন ভূখন্ড পাওয়ার সেই অভিলাষ কখনো পূরণ হবে কিনা। তবে গাজাবাসীকে আমাদের স্মরণে রাখা উচিত। প্রতিটি ইফতারে তাদের জন্য দুআ করা উচিত। এই লেখাটি লেখার আরেকটি উদ্দেশ্য হলো, নিজেদের অবস্থান ও জীবন যাপনের সুযোগ প্রদানের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার মানসিকতা জাগ্রত করা। যা আছে তার তুলনায় যা নেই- তা নিয়েই আমাদের সব আক্ষেপ। অথচ গাজাবাসীর প্রতিটি দিনের ঘটনা আমাদের চোখে পানি এনে দেয়। গাজা নিয়ে একটু ভাবলেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি, আল্লাহ তাআলা আমাদের কতটা ভালো রেখেছেন।

গাজা নিয়ে বেশি আলোচনা ও সচেতনতা তৈরি হওয়া দরকার নিজেদের জন্যেই। আজকের এই অবরুদ্ধ অবস্থায় গাজা উপত্যকা একদিনে আসেনি। ফিলিস্তিন সংকটও হুট করে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর পরাশক্তির নানা কূট চক্রান্ত, জায়নবাদের ষড়যন্ত্র এবং এসব হীন প্রক্রিয়া নিয়ে মুসলিম নেতাদের অসচেতনতার কারণেই ফিলিস্তিন সংকট এতটা ঘনীভূত হয়েছে। আর বছরের পর বছর এর খেসারত দিয়ে যেতে হচ্ছে ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষকে। আমাদের পরিণতি যেন কখনো গাজার মতো না হয়ে যায়, সেই জন্য নিয়মিত দোয়া করার পাশাপাশি চলমান জাতীয় ও আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নিজেদের সচেতন হওয়াও বড্ড জরুরি। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ