মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০২৪
Online Edition

ইরানের কনস্যুলেটে ইসরাইলী হামলায় আঞ্চলিক যুদ্ধের শঙ্কা

২ এপ্রিল, আলজাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস, এপি:  সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইরানের কনস্যুলেটে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিমূলক জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তেহরান। সোমবারের ওই হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শীর্ষ একজন কমান্ডার ও তার ডেপুটিসহ অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন।

এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, সোমবারের হামলায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) অভিজাত শাখা কুদস ফোর্সের জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ রেজা জাহেদি ও তার ডেপুটি জেনারেল মোহাম্মদ হাদি হাজি রাহিমি নিহত হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়ায় ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও তাদের মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করে আসছে ইসরায়েল। তবে সোমবারের হামলাটি প্রথমবারের মতো ইরানের কনস্যুলেট ভবনে চালানো হয়েছে।  

কী ঘটেছে?:  দামেস্কের মেজেহ জেলার প্রধান দূতাবাস ভবনের পাশে অবস্থিত কনস্যুলেটটি সোমবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫ টার দিকে আক্রান্ত হয়। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ছবিতে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের মাঝে ইস্পাতের খুঁটিতে লাগানো ইরানের একটি পতাকা এখনও ঝুলছে।

কারা ছিল সেখানে? আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হামলার সময় আইআরজিসির বেশ কয়েকজন সামরিক উপদেষ্টা ভবনটিতে ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে জাহেদি ও রাহিমিও রয়েছেন। জাহেদি ২০১৬ সাল পর্যন্ত লেবানন ও সিরিয়ায় কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকারবিষয়ক পর্যবেক্ষক সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলেছে, ইসরায়েলি ওই হামলায় আট ইরানি, দুই সিরিয়ান এবং একজন লেবানিজসহ মোট ১১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের সবাই যোদ্ধা।

ইরানের প্রতিক্রিয়া কী? সিরিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত হোসেন আকবরী হামলায় আহত হননি। তিনি বলেছেন, তেহরানের প্রতিক্রিয়া হবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তিমূলক। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দুল্লাহিয়ান এই হামলাকে ‘‘সব ধরনের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও চুক্তির লঙ্ঘন’’ বলে অভিহিত করেছেন। কনস্যুলেট ভবনে হামলার ঘটনায় ইসরায়েল জড়িত বলে দাবি করেছেন তিনি।

পৃথক এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নাসের কানানি বলেছেন, ইরানের প্রতিক্রিয়া জানানোর অধিকার রয়েছে। আর এই প্রতিক্রিয়ার ধরন ও হামলার শাস্তি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে তেহরান। জাতিসংঘে ইরানের মিশন বলেছে, এই হামলার ঘটনাটি জাতিসংঘের সনদ, আন্তর্জাতিক আইন এবং কূটনৈতিক ও কনস্যুলার চত্বর রক্ষার মূলনীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। অন্যদিকে, হামলার নিন্দা জানাতে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানি মিশন সংস্থাটির নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এই হামলা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য উল্লেখযোগ্য হুমকি বলে সতর্ক করে দিয়ে ইরানি মিশন বলেছে, হামলার চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার অধিকার রয়েছে তেহরানের। সিরিয়ায় কনস্যুলেট ভবনে ইসরায়েলি হামলার ঘটনার পরপরই তেহরানের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার মানুষ। তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দেশটির ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদের প্রতিক্রিয়া কী? ইরানের অন্যতম মিত্র সিরিয়া বলেছে, ইসরায়েলি হামলায় নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। হামলার পরপরই ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল মেকদাদ। তিনি বলেছেন, ‘‘আমরা দামেস্কে ইরানের কনস্যুলেট ভবন লক্ষ্য করে চালানো এই নৃশংস সন্ত্রাসী হামলা ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যার তীব্র নিন্দা জানাই।’’

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের মিত্র রাশিয়াও ইরানি কনস্যুলেটে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘আমরা সিরিয়ায় ইরানের কনস্যুলার মিশনের বিরুদ্ধে এই অগ্রহণযোগ্য হামলার তীব্র নিন্দা জানাই।’’ লেবাননের ইরান-সমর্থিত শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, দামেস্কে হামলার ঘটনায় ইসরায়েলকে চড়া মূল্য দিতে হবে। গত ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হামাসের সমর্থনে ইসরায়েলে প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালিয়ে আসছে হিজবুল্লাহ। গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ বলেছে, ‘‘এই অপরাধের জন্য শত্রুপক্ষকে শাস্তি পেতে হবে। অবশ্যই হামলার প্রতিশোধ নেওয়া হবে।’’ ইরাক, জর্ডান, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য মুসলিম দেশও এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে।

এদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার সাংবাদিকদের বলেছেন, ওয়াশিংটন ‘‘ওই অঞ্চলে ক্রবর্ধমান সংঘাত বৃদ্ধির কারণ হতে পারে এমন যেকোনও বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছে।’’ হামলার বিষয়ে জানতে চােইলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র সাংবাদিকদের বলেন, আমরা বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্য করি না। তবে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত চারজন ইসরায়েলি কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছে। তারা স্বীকার করেছে, দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে হামলার ঘটনায় ইসরায়েল জড়িত।

হামলার পরিণতি কী হতে পারে?: ইসরায়েল যে ইরানের সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করছে, কনস্যুলেট ভবনে হামলার ঘটনায় সেটি মনে হচ্ছে। কারণ দেশটির সামরিক বাহিনী গাজা ও লেবাননের সাথে সীমান্তে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে। তবে বিশ্লেষকরা এই হামলার ঘটনাটি আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু করতে পারে কি না তা নিয়ে বিভক্ত। 

ওয়াশিংটন ডিসির সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জন অল্টারম্যান বলেছেন, ইসরায়েল সম্ভবত এই হামলাকে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তিনি বলেন, ‘‘ইসরায়েলিরা নিশ্চিত যে, তারা যদি পিছিয়ে যায়, তাহলে হুমকি কমার পরিবর্তে আরও বাড়বে। এই ধরনের হামলার ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে গেলে তা প্রতিপক্ষ শক্তিকে দুর্বল করবে বলে তারা মনে করে।’’

তবে ওয়াশিংটনের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষক স্টিভেন কুক বলেছেন, উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘আইআরজিসি ইরাক এবং সিরিয়ায় প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে পারে। এর মাধ্যমে মার্কিন বাহিনীকে আবারও বিপদে ফেলতে পারে তারা। ইরানিরা হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা বাড়ানোর নির্দেশও দিতে পারে; যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর প্রধান মুখপাত্র ড্যানিয়েল হ্যাগারি বলেছেন, সোমবার দক্ষিণ ইসরায়েলের একটি নৌ ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা হামলা হয়েছে। ইরানের নির্দেশে চালােনো এই হামলায় কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

গতকাল মঙ্গলবার সকালের দিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, সিরিয়া থেকে ইসরায়েলের দিকে ছোড়া কিছু অস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই বিধ্বস্ত হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রোজেক্টের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেছেন, দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে হামলার জেরে সংঘাত বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। তবে সেটি ইসরায়েলের জন্য খুব বেশি উদ্বেগের বিষয় নাও হতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ