মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪
Online Edition

আসাদ বিন হাফিজের সাহিত্যভুবন

রফিক মুহাম্মদ

কবি আসাদ বিন হাফিজ (জন্ম : ১ জানুয়ারি ১৯৫৮ - মৃত্যু : ১ জুলাই ২০২৪) বাংলাদেশের বিশ্বাসদীপ্ত সাহিত্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সিপাহসালারদের অন্যতম একজন। বিচিত্র সৃষ্টির বিত্ত-বৈভবে তিনি গড়ে তুলেছেন তার রচিত সাহিত্যভুবন। কবিতা, ছড়া, গান, প্রবন্ধ, ফিকশনসহ আরও নানাবিধ লেখায় তিনি ছিলেন একেবারেই সচল। তবে শিশুসাহিত্য তথা ছড়ার ক্ষেত্রে আসাদ বিন হাফিজ ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও সাবলীল। তারপর ‘কি দেখ দাঁড়িয়ে একা সুহাসিনী ভোর’ (১৯৯০) ও ‘অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’ (১৯৯৬) মাত্র এ দুটি কবিতার বই লিখে কবি হিসাবেই তিনি বেশি পরিচিত। যদিও তার লেখা শতাধিক গ্রন্থের মধ্যে ‘ভাষা আন্দোলন : ডান-বাম রাজনীতি’ (১৯৯০) ও ‘ইসলামী সংস্কৃতি’ (১৯৯৫) এ দুটি গ্রন্থ খুবই ঋদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ। তবে যে বিষয়েই তিনি লিখেছেন তার মূল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য একটাই। ইসলামী মূল্যবোধকে সামনে রেখেই তিনি তার রচনাকে সাজিয়েছেন। তার রচনার পুরোটাই বিশ্বাসী চেতনায় উদ্ভাসিত। আল কোরানের আলো আর হেরার নুরে আলোকিত তার প্রতিটি রচনা।

মৃত্যুর মাত্র ক’দিন আগে সর্বশেষ গত ২৮ জুন বাদ আসর ‘সবাই একটু খাট’ এই শিরোনামে তিনি তার ফেসবুক আইডিতে যে ছড়াটি পোস্ট দিয়েছেন তাতে তিনি বলেছেন, জাতির ঘাড়ে জমলে কিছু/আবর্জনা পাপ/তখন আসে পথ দেখাতে/ চন্দ্রবোড়া সাপ....বাঁচতে হলে জগতবাসী/হেরার পথে হাঁটো/ সুন্দর সমাজ গড়ার জন্য সবাই একটু খাটো। এর আগে একই দিন বাদ জুম্মা ‘হৃদয় মনে আঁকি’ শিরোনামে আরেকটি ছড়া ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, আর্ত এবং অসহায়ের সাথী হতে চাই/সব মানুষকে আমি যেন বলতে পারি ভাই/ হিংসা এবং অহংকার করতে পারি দূর/ আমার মনে থাকে যেনো আল কুরানের নূর। এমনি ভাবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তার রচনাকে হেরার নূর ও আল কুরানের আলোতে রঙিন করেছেন।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, কবি ফররুখ আহমদ ও আল মাহমুদ প্রমুখ কবিদের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে ইসলামী ভাব ধারার সাহিত্যের যে ভুবন রচিত হয় তাকে আরও বিকশিত করেন আশির দশকের এক দল তরুণ মেধাবি কবি। এই কবিরা হলেন, কবি মতিউর রহমান মল্লিক, কবি হাসান আলীম, কবি মোশাররফ হোসেন খান, কবি সোলায়মান আহসান, কবি মুকুল চৌধুরী, কবি গোলাম মোহাম্মদ, কবি আসাদ বিন হাফিজ প্রমুখ। আসাদ বিন হাফিজ তার লেখালেখির শুরুতেই ছন্দের নিপুণ খাঁথুনিতে ইসলামী আন্দোলনের চেতনাকে ‘গুডবাই কামরুন চললাম/ দেখা হবে শেষ হলে সংগ্রাম...’এ ছড়ার মাধ্যমে তুলে ধরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। যে বাঁধের মাধ্যমে ভারত এদেশের নদীকে মেরে ফেলছে, এদেশকে মরুময়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে সেই মরণ বাঁধ ফারাক্কা নিয়ে আশির দশকেই তিনি লিখেন ‘ছড়া নয় ছড়া নয়/ ছড়িয়ে দিলাম বিষ/ ফারাক্কার তলে তলে মাইন পুতে দিস। এই ছড়াটিও তখন ব্যাপক আলোচিত হয় এবং আসাদ বিন হাফিজকে জনপ্রিয় করে  তোলে।

আসাদ বিন হাফিজ তার সাহিত্যে ইসলামী চেতনাকে তুলে ধরেছেন একেবারেই সুস্পষ্ট ভাষায়। উপমা উৎপ্রেক্ষা বা রূপকের ব্যবহার জানলেও তিনি তার বিশ্বাসকে তুলে ধরেছেন সহজ সরল ভাষায়। তবে তার সে ভাষা খুবই উচ্চকিত এবং উদ্দীপ্ত। তিনি তার স্বপ্ন তার বিশ্বাসকে অবলীলায় তার লেখায় তুলো ধরেছেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি ইসলামী সমাজের। যে সমাজ ব্যবস্থায় কেবল আল্লাহ ও তার রাসুলের আইন চলবে। যেখানে মানুষ কেবল গোলামি করবে মহান রাব্বুল আলামিনের। এ বিষয়টিই তার সাহিত্য সৃষ্টির মূল চেতনা।

কবি আসাদ বিন হাফিজ যে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন তা তিনি তার কবিতায় অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন। তিনি তার ‘অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’ এই কবিতায় সে বিপ্লবের কথাই চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি যে-সমাজের স্বপ্ন দেখেন তার অসাধারণ এক কাব্যিক রূপ দিয়েছেন এই কবিতায়। যা বাংলা সাহিত্যে আর কোনো কবির রচনায় এ ভাবে প্রস্ফুটিত হয়নি। কবি বলেছেন, আমি আমার জনগণকে আরেকটি অনিবার্য/বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলছি।.../ যে বিপ্লব সাধিত হলে মানুষের শরীর থেকে/খসে পড়ে শয়তানের লেবাস/জল্লাদের অশান্ত চিত্তে জন্ম নেয় বসরাই গোলাপ/ অর্ধ পৃথিবীর দুর্দান্ত শাসক কেঁপে ওঠে ফোরাত কূলের কোন/ অনাহারী কুকুরের আহার্য চিন্তায়।...সেখানেই বিপ্লব/ যেখানে নগ্নতা ও বেহায়াপনার যুগল উল্লাস/ সেখানেই বিপ্লব/ যেখানে মিথ্যার ফানুস সেখানেই বিপ্লব/ যেখানে শোষণ ও সুদের অক্টোপাস ক্যান্সার/ সেখানেই বিপ্লব ... [ অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার]

কবি কোন ধরনের বিপ্লব চান তা তিনি এ কবিতায় এভাবেই স্পষ্ট করেছেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে, ইসলামী বিপ্লবের কথা এর আগে আর কোনো কবি এমন উচ্চকিত ভাষায়, এতো সার্থক ও সফলভাবে বলতে পারেনি, বা বলেন নি। কবি আসাদ বিন হাফিজ এ কবিতায় তার সেই স্বপ্নের ইসলামী সমাজের একটি চমৎকার চিত্রও তুলে ধরেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। কবিরা মানুষদের স্বপ্ন দেখায়। কবি আসাদ বিন হাফিজও তার এ কবিতার মাধ্যমে মানুষকে ইসলামী সমাজ গঠনের বিপ্লবের স্বপ্ন দেখিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ